# a b c d e f g h i j k l m n o p q r s t u v w x y z
গরমে মাথার ত্বকের সংক্রমণ এড়াতে কী করবেন?

গরমে মাথার ত্বকের সংক্রমণ এড়াতে কী করবেন?

Untitled design (3)

বসন্ত শেষে প্রকৃতিতে এসেছে গ্রীষ্মকাল, সেই সাথে নিয়ে এসেছে প্রচন্ড গরম, তাপ, ঘাম ও অত্যধিক আর্দ্র আবহাওয়া। এই গরমে মাথার ত্বকের সংক্রমণ বা স্ক্যাল্প ইনফেকশন একটি সাধারণ সমস্যা। প্রচন্ড গরমে মাথার ত্বক ঘেমে থাকে, যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস খুব সহজেই আক্রমণ করে বসে।

স্ক্যাল্প ইনফেকশনের ফলে স্ক্যাল্প চুলকানো, লালচে ভাব, খসখসে ভাব দেখা দেয় এমনকি চুল পড়া বেড়ে যায়। এছাড়াও চুল রুক্ষ, শুষ্ক, ফ্রিজি হয়ে যাওয়ার সমস্যা তো আছেই। আজকের ফিচারে মাথার ত্বকের সংক্রমণ, এর কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ নিয়ে জানবো।

গরমে মাথার ত্বকের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণ

১. স্ক্যাল্প ঘেমে থাকা

প্রচন্ড আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে আমাদের শরীর খুব সহজেই ঘেমে যায়। স্ক্যাল্পও দ্রুত ঘেমে যায় এবং চুলের কারণে এই ঘাম সহজে শুকানো অনেক সময় সম্ভব হয়না। এতে মাথার ত্বক চিটচিটে হয়ে পড়ে এবং সেখানে খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাইক্রোঅর্গানিজম আক্রমণ করে৷ এজন্য গরমে মাথার ত্বকের সংক্রমণ বেড়ে যায়।

২.ব্যাকটেরিয়াল স্ক্যাল্প ইনফেকশন

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া ব্যাকটেরিয়া আক্রমণের জন্য বেশ উপযোগী। বিশেষত স্ট্যাফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই মাথার ত্বককে আক্রমণ করে যার ফলে মাথার ত্বকে প্রদাহ, ছোট ছোট বাম্পস, চুলকানির মতো সমস্যা দেখা দেয়।

৩. ফাংগাল ইনফেকশন

অতিরিক্ত গরমে আর্দ্রতা ও ঘামের জন্য মাথার ত্বকে ফাংগাল আক্রমণ দেখা দেয়। যার ফলে মাথার ত্বকে দেখা দেয় খুশকি, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস ইত্যাদি।

৪. সঠিকভাবে মাথার ত্বক পরিষ্কার না করা

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য স্ক্যাল্প খুব সহজেই ঘেমে যায় ও আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে তেল উৎপাদন করে, যা হেয়ার ফলিকল কে আটকে দেয়। এছাড়াও ঘাম ও তেল খুব সহজেই ময়লা ও জীবাণুকে আকর্ষণ করে, তাই স্ক্যাল্প গরমের দিনে খুবই দ্রুত নোংরা হয়ে বিভিন্ন ইনফেকশন দেখা দেয়। এজন্য নিয়মিত ভালো ক্লেনজার বা শ্যাম্পু দিয়ে স্ক্যাল্প পরিষ্কার করা উচিত, তা না হলে ইনফেকশনের সমস্যা বেড়ে যায়।

৫. দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকা

রোদের প্রখর তাপের নীচে সরাসরি দীর্ঘক্ষণ থাকলে তা শরীরের ত্বকের পাশাপাশি মাথার ত্বকেরও ক্ষতি করে। এর ফলেও স্ক্যাল্পে ইনফেকশন দেখা দেয়।

এছাড়াও ত্বকে বিভিন্ন এলার্জির সমস্যার জন্যেও স্ক্যাল্প ইনফেকশন হতে পারে।

মাথার ত্বকের সংক্রমণ থেকে পরিত্রাণের উপায়

১. মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে। ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত হলে ফাংগাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান সমৃদ্ধ শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে।

২. গরমকালে যেহেতু খুব দ্রুতই মাথার ত্বক ঘেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই এ সময় একদিন পরপর বা প্রতিদিনই শ্যাম্পু করার প্রয়োজন হতে পারে। এটি নির্ভর করে কতো দ্রুত আপনার স্ক্যাল্প নোংরা হয়ে পড়ছে তার উপর।

৩. যেহেতু গরমে শ্যাম্পু করার পরিমাণ বাড়াতে হয় তাই এসময় একটি মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করা উচিত। এতে মাথার ত্বক ও চুলের ন্যাচারাল অয়েল দূর হয়ে চুল ড্রাই হয়ে যাবে না।

৪. নিজের চিরুনি, হেয়ার বনেট, তোয়ালে, বালিশ ইত্যাদি জিনিসগুলো কারো সাথে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এগুলোর মাধ্যমে খুব সহজেই একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।

৫. যেহেতু ভেজা ও আর্দ্র ত্বক খুব সহজেই সংক্রমিত হয় তাই গোসলের পর ভেজা চুল এবং ঘামে ভেজা চুল খুব দ্রুত শুকিয়ে নিতে হবে।

৬. সরাসরি রোদের আলো থেকে মাথার ত্বককে দূরে রাখতে হবে। মাথার ত্বক সরাসরি যেনো সানবার্নের শিকার না হয় সেজন্য মাথার ত্বক স্কার্ফ, পাতলা কাপড়, হিজাব, হ্যাট অথবা ছাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে৷

৮.প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। এধরনের খাবার দেহের ইমিউনিটি বাড়ায় ও বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

আশা করি উপরের টিপস গুলো মেনে চলে এই গরমেও আপনার স্ক্যাল্প থাকবে একদম ফ্রেশ আর চুল থাকবে সুন্দর ও ঝলমলে। তবে যদি সংক্রমণ অতিমাত্রায় বেড়ে যায় তাহলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

ছবি- সাটারস্টক

‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ অর্থনীতি

‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ অর্থনীতি

 ০১. ‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ অর্থনীতি

সত্তরের দশকে বাংলাদেশে মাত্র তিনজন অধ্যাপক ছিলেন যাঁরা প্রত্যেকে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এঁরা সম্মানসূচক ডিগ্রিধারী ছিলেন না; এঁদের তিনজনই কষ্ট করে অভিসন্দর্ভ রচনা করে ডিগ্রি লাভ করেন। এঁদের মধ্যে মিলের চেয়ে বৈসাদৃশ্য ছিল অনেক বেশি। এঁরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয় পড়াতেন। এঁদের আচার-আচরণেও তেমন মিল ছিল না। এঁদের বাড়ি ছিল তিনটি ভিন্ন জেলায়। তবু এঁদের তিনজনের একই পরিণতি ঘটে। এঁরা তিনজনই দুর্নীতির দায়ে জেল খাটেন (তিনজনই দাবি করেছেন যে এঁরা নির্দোষ)। এরপর বাংলাদেশে ‘ডাবল পিএইচডির’ (হয়তো দুর্নীতি দমন কমিশনের ভয়ে) আর খবর পাওয়া যায়নি। সংখ্যাতত্ত্বের সূত্র অনুসারে। বাংলাদেশে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি নিলে দুর্নীতির দায়ে জেল খাটার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লিখিত তিনজন অধ্যাপকই পরলোকগমন করেছেন। যদি ইতোমধ্যে কেউ ডাবল পিএইচডি অর্জনের চেষ্টা করেন, তবে তার জেলে যাওয়ার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

১. সহগমন (Corelation) বনাম কার্যকরণ (Causation)

এখানে সংখ্যা ঠিকই আছে তবে তত্ত্ব নেই। ডাবল পিএইচডিরা দল বেঁধে জেলে গেলেই পিএইচডি ডিগ্রির জন্য এঁরা দুর্নীতি করেছেন, এ সূত্র প্রমাণিত হয় না। এমনও হতে পারে যে এ তিনজন অধ্যাপকই গরিব ঘরের সন্তান। কাজেই উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়ে অর্থের লোভ সামলাতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে দোষটা দুটি পিএইচডির নয়। মূল সমস্যা হলো, তাঁদের সামাজিক পরিবেশ। আবার এমনও হতে পারে, যারা ডাবল পিএইচডি করেন, তাঁরা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তাঁরা নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। তাই তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসে। এখানেও কারণ হলো উচ্চাভিলাষ, দুটি পিএইচডি নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ডাবল পিএইচডির সঙ্গে দুর্নীতির কার্যকারণ সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা না করা যাবে, ততক্ষণ এ ধরনের সম্পর্ক কাকতালীয় বলেই বিবেচিত হবে।

আরেকটি উদাহরণ বিবেচনা করুন। জাপানিরা খুব কম চর্বিযুক্ত খাবার খায়। এদের মধ্যে হৃদ্‌রোগীর সংখ্যা অতি নগণ্য। ইংরেজ ও মার্কিনরা গবগব করে চর্বি গেলে। এদের মধ্যে হৃদ্‌রোগের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। বেশি চর্বি খেলে হার্টের ব্যামো হয়, এই অনুমানটি উপরিউক্ত তথ্য সমর্থন করে। কিন্তু সংখ্যাতত্ত্ববিদেরা বলছেন, ফরাসিরাও অনেক চর্বি খায়। অথচ মার্কিন বা ইংরেজদের চেয়ে এদের হৃদ্‌রোগ অনেক কম হয়। সংখ্যার ভিত্তিতে তাই হৃদ্‌রোগ আর স্নেহজাতীয় পদার্থের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

একই সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, জাপানিরা লাল মদ কম খায়। তাদের হৃদ্‌রোগের হার কম। আবার ইতালিয়ানরা প্রচুর লাল মদ খায়, অথচ এদের মধ্যে ইংরেজ বা মার্কিনদের তুলনায় হৃদ্‌রোগের হার কম। ইংরেজ আর মার্কিনরা প্রচুর লাল মদ পান করে এবং তাদের হৃদরোগে ভোগার হার সর্বোচ্চ। তাই লাল মদের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্কও প্রতিষ্ঠা করা গেল না।

তবে এই সমীক্ষা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যারা জাপানি, ফরাসি বা ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলে তাদের তুলনায় ইংরেজি ভাষায় যারা কথা বলে তাদের মধ্যে হৃদ্‌রোগের হার অনেক বেশি। তাহলে কি ধরে নেব যে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের জন্যই ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হৃদয়ঘটিত ব্যায়ো অনেক বেশি। যত যুক্তিই দেখান না কেন, ডাক্তারদের কাছে এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য করতে হলে প্রথমে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে হৃদ্‌রোগের কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের ব্যাখ্যা কল্কে পাবে না।

তবু সবকিছুর সহজ ব্যাখ্যা সব সময় সম্ভব হয় না। এই উদাহরণটি বিবেচনা করুন। অর্থনীতিতে যখন মন্দা দেখা দেয়, তখন পরিবারের সদস্যরা চাকরি হারায়। পরিবারের আয় কমে যায়। তাই বাড়ির কর্তা ও গিন্নিকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করতে হয়। মন্দার সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাই দেখা যায় দামি গাড়ি, ব্যয়বহুল পোশাক বা দামি সেন্টের চাহিদা কমে যায়। অথচ মন্দা দেখা দিলেই লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায়। গত শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন মহামন্দা দেখা দেয়, তখন লিপস্টিক বিক্রি পঁচিশ শতাংশ বেড়ে যায়। পরবর্তীকালেও যখন মন্দা দেখা দেয়, তখনি লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায়। অনেকে বলছেন লিপস্টিকের বিক্রি-বৃদ্ধিকে মন্দার একটি পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আবার অনেকে বলছেন এ সহগমনের কোনো তাৎপর্য নেই (The Economist, January 24th 2009)।

ওপরের উদাহরণগুলি থেকে দেখা যাচ্ছে যে শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে সত্য জানা যাবে–এ অনুমানের কোনো ভিত্তি নেই। সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে মহা বিরক্ত হয়ে অনেকে বলছেন : Lies, Damn lies and Statistics (মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও সংখ্যাতত্ত্ব)। এঁদের মতে, সংখ্যাতত্ত্ব ডাহা মিথ্যার চেয়েও বিপজ্জনক।

২. গোয়েন্দাগিরিতে সংখ্যাতত্ত্ব

সংখ্যাতত্ত্বের দুর্বলতা সত্ত্বেও অনেক অর্থনীতিবিদেরই সংখ্যাতত্ত্বে আস্থায় কখনো চিড় ধরেনি। অতিসম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক স্টিভেন ডি লেভিট (Steven D. Levitt) প্রখ্যাত সাংবাদিক স্টিফেন জে ডুবনারের (Stephen J. Dubner) সহযোগিতা নিয়ে Freakonomics ও Super freakonomics দুটি বই লিখেছেন। একজন অর্থনীতিবিদ আর সাংবাদিকের জুটি বাধার কারণ হলো অর্থনীতিবিদের যত বক্তব্য আছে তত জোরালো ভাষা নেই। আর সাংবাদিকের কলমের জোর থাকলেও অর্থনীতি ও সংখ্যাতত্ত্বের মতো খটোমটো বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সীমিত। সংখ্যাতত্ত্বের সাফাই গাইতে গিয়ে লেভিট ও ডুবনার (২০০৯, ১৬) লিখেছেন, ‘Some people may argue that statistics can be made to say anything, to defend indefensible causes or tell pet lies. But the economic approach aims for the opposite: to address a given topic with neither fear nor favor, letting numbers speak the truth’ (alcance যুক্তি দেখান যে সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে যা ইচ্ছে করা যায়, অগ্রহণীয় বক্তব্য সমর্থন করা যায় এবং পছন্দমতো মিথ্যে বলা যায়। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণের লক্ষ্য হলো এর বিপরীত, ভয়ে বা কাউকে অনুরাগ দেখানোর জন্য নয়, সোজাসুজি সংখ্যার ভিত্তিতে সত্যকে তুলে ধরা)।

ফ্ৰিকনোমিকস ও সুপার ফ্ৰিকনোমিকস বই দুটির তাত্ত্বিক লেভিট মনে করেন, উপযুক্ত উপাত্ত পাওয়া গেলে সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে যেকোনো সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব। এমনকি প্রতারক, ঠকবাজ ও অপরাধীদের খুঁজে বের করা সম্ভব। দুটি ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে গোয়েন্দাগিরিতে তারা। সংখ্যাতত্ত্বের জ্ঞান প্রয়োগ করেছেন : (১) শিকাগো স্কুল বোর্ডের পরীক্ষায় নকলে সহায়তাকারী শিক্ষকদের শনাক্তকরণ, (২) জাপানে ঐতিহ্যবাহী সুমা কুস্তিতে পাতানো প্রতিযোগিতা উদঘাটন।

নকলে সহায়তাকারী শিক্ষকদের শনাক্তকরণ

১৯৯৬ সালের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে স্কুলের ছাত্রদের মূল্যায়ন তাদের শিক্ষকেরা নিজেরাই করতেন। অভিভাবক ও স্কুল বোর্ডকে খুশি করার জন্য তারা তাদের ছাত্রদের বেশি নম্বর দিতেন, এতে ছাত্রদের স্কুলে কী রকম পড়ানো হচ্ছে তা বিচার করা সম্ভব ছিল না। স্কুল বোর্ড তাই ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষাবর্ষের শেষে ছাত্রদের একটি বাইরের পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে। এ পরীক্ষা চালু করার পর শিক্ষা বোর্ড সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যেসব শিক্ষকের ছাত্ররা অস্বাভাবিক উচ্চ হারে পরীক্ষায় ফেল করবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। শিকাগোতে এমন অনেক শিক্ষক ছিলেন, যাঁদের ছাত্রদের মান ছিল অত্যন্ত নিচু। এ ধরনের শিক্ষকেরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে খারাপ ছাত্রদের খাতা পরীক্ষা করার জন্য কম্পিউটারে জমা দেওয়ার আগে তাড়াতাড়ি করে তাদের ভুল উত্তর মুছে সঠিক উত্তর লিখে দিতেন। শিক্ষকদের এহেন কীর্তিকলাপের গুজব শুনে ২০০২ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক লেভিট গবেষণার জন্য ৩০ হাজার ছাত্রের পরীক্ষার খাতা সংগ্রহ করেন। কম্পিউটারের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা যায়, যেসব শিক্ষক ছাত্রদের খাতা জাল করেন তারা একই শ্রেণীর অনেকগুলি খাতায় পর পর বেশ কয়েকটি প্রশ্নের একই উত্তর দেন। এর ভিত্তিতে কোন কোন শ্রেণীতে নকল হয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব। এ খবর শুনে শিকাগো শিক্ষা বোর্ড লেভিটকে নকলবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু কোন ক্লাসে নকল হয়েছে তা অনুমান করা গেলেও প্রমাণ করা সোজা নয়। কারণ এ ধরনের নকলের কোনো সাক্ষ্য নেই। একটি উপায় হলো বোর্ডের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সন্দেহভাজন শ্ৰেণীগুলির আবার পরীক্ষা নেওয়া। নকল হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট শ্ৰেণীগুলোর দ্বিতীয় পরীক্ষার ফলাফল প্রথম পরীক্ষার (যেখানে নকলের জন্য নম্বর বেড়েছে) চেয়ে লক্ষণীয়ভাবে খারাপ হবে। তবে নকল ধরার পরীক্ষা বলে প্রকাশ্যে এ পরীক্ষা নিতে গেলে শিক্ষকেরা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারেন। পক্ষান্তরে উদ্দেশ্য না জানিয়ে পরীক্ষা নিলে শিক্ষকেরা যুক্তি দেখাবেন, ছাত্ররা দ্বিতীয় পরীক্ষাটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি–এই কারণে ফল খারাপ হয়েছে। তাই যেসব শ্রেণীতে নকল হয়নি সে ধরনের কিছু ক্লাসেও একই পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে প্রথম পরীক্ষায়। যেসব ক্লাসে নকল হয়নি সেসব ক্লাসের ছাত্ররা গড়ে প্রথম পরীক্ষার অনুরূপ বা বেশি নম্বর পেয়েছে। অথচ যেসব ক্লাসে নকল হয়েছে বলে সন্দেহ করা। হয়, সেসব ক্লাসের ছাত্ররা প্রথম পরীক্ষার চেয়ে দ্বিতীয় পরীক্ষায় অনেক কম নম্বর পেয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, এসব ক্লাসে নকল হয়। এর ভিত্তিতে ১২ জন শিক্ষককে জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষককে সতর্ক করা হয়।

ঐতিহ্যবাহী সুমো কুন্তিতে পাতানো প্রতিযোগিতা

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে সুমো কুস্তি জাপানিদের একটি প্রিয় ক্রীড়া। এই কুস্তি জাপানিদের শিন্টো ধর্মের আচার হিসেবে স্বীকৃত। সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুমো কুস্তিগিরেরা লাখ লাখ ডলার কামাই করেন। উচ্চ আয়ের সম্ভাবনা থাকায় এ ক্রীড়ার প্রতি অনেকেই আকৃষ্ট হন। কিন্তু এই উচ্চ আয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের মাত্র ৬৬ জন কুস্তিগিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। প্রথম ৪০ জন কুস্তিগির প্রত্যেকে বছরে কমপক্ষে ১ লাখ ৭০ হাজার ডলার কামাই করেন। অথচ ৬৭তম স্থান। অধিকারী কুস্তিগিরের বার্ষিক আয় মাত্র ১৫ হাজার ডলার। প্রথম ৬৬টি জন। কুস্তিগিরের মধ্যে থাকতে হলে প্রতি দুই মাস অন্তর ১৫টি কুস্তি লড়তে হয়। এর মধ্যে কমপক্ষে আটটি কুস্তিতে জিততে হয়। প্রথম ১৪টি কুস্তির মধ্যে। যারা আটটি বা তার বেশি কুস্তিতে জয় লাভ করেন, ১৫তম কুস্তিতে হারলেও তাঁদের কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু কিছু কিছু কুস্তিগির প্রথম ১৪টি কুস্তির সাতটিতে জয় লাভ করেন। সর্বশেষ অর্থাৎ ১৫ নম্বর কুস্তিতে হেরে গেলে তাঁরা তাঁদের সর্বোচ্চ মর্যাদা হারান। এই ধরনের খেলাতে যারা সাতটি খেলায় জিতেছেন তারা ইতিমধ্যে আটটি খেলায় বিজয়ীদের উৎকোচ দিয়ে কুস্তি জেতা নিশ্চিত করেন। এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে আটটি কুস্তিতে বিজয়ীর কোনো লোকসান হয় না। অথচ সাতটি খেলায় বিজয়ীদের বড় ধরনের লাভ হয়। ১৯৯০-এর প্রথম দিকে ডেভিড বেঞ্জামিন নামে একজন লেখক এই ধরনের পাতানো কুস্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু জাপানিরা তখন তার এ বক্তব্য আমলে নেয়নি। ১৯৯৬ সালে দুজন সুমো কুস্তিগির পাতানো খেলা ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ করেন। অল্প কদিনের মধ্যে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে এঁরা দুজনেই মারা যান।

২০০২ সালে লেভিট ও তাঁর সহকর্মী মার্ক ডুগান সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে সাতটি কুস্তিতে জয় লাভ করে যেসব কুস্তিগির ১৫ নম্বর কুস্তিতে অংশ নেন, তাঁরা ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে জয় লাভ করেন। অথচ সংখ্যাতাত্ত্বিক সম্ভাবনা অনুসারে এঁদের ৪৮.৭ শতাংশ বিজয়ী হতে পারেন। এতে প্রমাণিত হয় যে সুমো কুস্তিতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। কিন্তু জাপানি কর্তৃপক্ষ সরাসরি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। এ ধরনের অভিযোগ ছাপানোর জন্য জাপানি আদালত ২০০৭ সালে একটি জাপানি কাগজকে জরিমানা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে জাপানি শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে যে কুস্তিগিরদের সেলফোনের খুদে বার্তা বিশ্লেষণ করে পাতানো কুস্তির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০১১ সালে মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কুস্তির ফলাফল বাতিল ঘোষিত হয়। (Economist, February 12, 2011, 36) অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সংখ্যাতত্ত্বের কাছে প্রতারক কুস্তিগিরদের হার মানতে হলো।

৩. আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি

এই ধরনের মজার বিষয় নিয়ে লেভিট ও ডুবনার যে দুটি বই লিখেছেন তাদের নাম রাখা হয়েছে Freakonomics (আজব অর্থনীতি) ও Super Freakonomics (জবর-আজব অর্থনীতি)। ইংরেজি freak শব্দটির সঙ্গে Economics শব্দটির সন্ধি করে freakonomics শব্দটি পয়দা করা হয়েছে। Freak শব্দটির অর্থ হলো উদ্ভট, আজব অথবা খাপছাড়া। আজব আর ‘অর্থনীতি’ শব্দ দুটি হচ্ছে বিপরীতধর্মী। অর্থনীতির একটি মৌল প্রতর্ক হলো, মানুষের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ড কতগুলি সূত্র অনুসরণ করে।

সূত্র মেনে অর্থনীতি চললে সেখানে আজব বা খাপছাড়ার কোনো স্থান নেই। তাহলে আজব অর্থনীতি বা জবর-আজব অর্থনীতি, কোনো শিরোনামেরই অর্থ হয় না। তাই বই দুটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে শিরোনামের তাৎপর্য নিয়ে : ‘আজব’ ও ‘জবর-আজব’ শব্দ দুটি কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আমার মনে হয় যে বই দুটির বিষয়বস্তু তিন অর্থে আজব। প্রথমত, এ বইয়ের বিষয়বস্তুগুলি অর্থনীতির মূল ধারার সঙ্গে খাপ খায় না। চিরাচরিতভাবে অর্থনীতিবিদেরা যেসব বিষয়ে মাথা ঘামান তা এখানে নেই। পক্ষান্তরে এ দুটি বইয়ে যেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে তা অর্থনীতির আওতায় সীমাবদ্ধ নয়। লেখকদ্বয় বলছেন, তাঁদের বইয়ে অর্থনীতি না থাকলেও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ’ (economic approach) রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এ দুটি বইয়ে অনেক কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য রয়েছে, যা সাধারণ পাঠকদের কাছে আজগুবি মনে হবে। এগুলি সরাসরি অর্থনীতিসংক্রান্ত না হলেও পাঠকের নজর কেড়ে নেয়। তৃতীয়ত, এ দুটি বইয়ে তথ্য-উপাত্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে অনেক প্রচলিত মত প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বই দুটির বক্তব্য সঠিকভাবে বোঝার জন্য এ তিনটি বিশেষত্বের সম্যক উপলব্ধির প্রয়োজন রয়েছে।

৪. ‘অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ’

সাধারণত পাঠকেরা অর্থনীতির বইয়ে মানুষের রুটি-রোজগারের সমস্যার সমাধান খোঁজেন। এ ধরনের প্রশ্ন আলোচিত হয় সামষ্টিক অর্থনীতিতে। এ দুটি বইয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি বা এ ধরনের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। শুধু ব্যাষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূত্র প্রয়োগ করা হয়েছে অপরাধ, পতিতাবৃত্তি, সন্তান পালন, প্রতারণা ইত্যাদি সমাজতাত্ত্বিক সমস্যার বিশ্লেষণে। কৈফিয়ত হিসেবে বলা হয়েছে, বই দুটি সরাসরি অর্থনীতিসংক্রান্ত নয়, তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ ধারণাটির জনক হচ্ছেন গ্যারি বেকার (Gary Becker)। ১৯৯২ সালে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। বেকার (১৯৯২) অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘It is a method of analysis and not an assumption about particular motivations. …Behavior is driven by a much richer set of values and preferences.’ (এটি হচ্ছে একটি বিশ্লেষণের পদ্ধতি, বিশেষ প্রণোদনা সম্পর্কে পূর্বানুমান নয়।…মানুষের আচরণ অনেক বেশি সমৃদ্ধ মূল্যবোধ ও অভিরুচি দ্বারা তাড়িত হয়)।

গ্যারি বেকারের মতে, অর্থনীতি শুধু সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের সূত্রমালা নয়, অর্থনীতি হচ্ছে একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করা যায়। এ ধরনের বিশ্লেষণের জন্য জানতে হবে মানুষ কী চায়। এই সমস্যাটিই রবীন্দ্রনাথ অতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ‘ঐকতান’ কবিতায় :

সব চেয়ে দুর্গম-যে মানুষ আপন-অন্তরালে,
তার পূর্ণ পরিমাপ নাই বাহিরের দেশে কালে।
সে অন্তরময়,
অন্তর মিশালে তবে তার অন্তরের পরিচয়।
পাই নে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার;

একমাত্র মানুষের অন্তরের পরিচয় জানলেই তার আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কিন্তু তার অন্তরের প্রবেশের দ্বার সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। এটাই। হলো অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণের সমস্যা।

৫. আজব তথ্য

অজস্র আজব তথ্যে ঠাসা এ দুটি বই। কোনো কোনো তথ্য বই দুটির বক্তব্য প্রতিপাদনের জন্য প্রয়োজন ছিল। আবার কোনো কোনো তথ্য আনন্দ বা জ্ঞানদানের জন্য পরিবেশন করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো :

নিউ ইয়র্ক শহরে ঘোড়ার নাদার বিভীষিকা

বিশ শতকের শুরুতে নিউ ইয়র্ক শহরে ২ লাখ ঘোড়া ছিল। ঘোড়া ও ঘোড়াবাহিত শকটই ছিল শহরে যাতায়াতের প্রধান বাহন। নিউ ইয়র্ক শহরে প্রতি ১৭ জন লোকের জন্য একটি ঘোড়া ছিল। ১৯০০ সালে ঘোড়ার গাড়ির দুর্ঘটনায় নিউ ইয়র্কে ২০০ ব্যক্তি নিহত হয়, পক্ষান্তরে ২০০৭ সালে মোটরগাড়ির দুর্ঘটনায় মারা যায় ২৭৪ জন, যদিও এ সময়ে শহরের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে ঘোড়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্ঘটনা নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঘোড়ার নাদা পরিষ্কার করা। নিউ ইয়র্ক শহরে তখন দৈনিক জমত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ঘোড়ার মল। এভাবে বছরে জমা হতো ১ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টন নাদা। নিউ ইয়র্ক শহরের বিভিন্ন খালি জমিতে গড়ে উঠত নাদার স্তূপ। কোথাও কোথাও এ স্তূপ ৬০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতো। রাস্তার দুধারেও জমানো হতো ঘোড়ার মল। বৃষ্টি হলে ঘোড়ার নাদা গলে রাস্তাঘাট সয়লাব হয়ে যেত। নাদার গন্ধে সারা শহরে এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হতো। আজ থেকে ১০০ বছর আগে নিউ ইয়র্ক শহরে তাই নগর উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ঘোড়ার নাদা। ১৮৯৮ সালে নিউ ইয়র্কে প্রথম আন্তর্জাতিক নগর উন্নয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আশা করা হয়েছিল, ১০ দিনব্যাপী এ সম্মেলনে নগর উন্নয়নের জন্য ঘোড়ার নাদার একটি সন্তোষজনক সমাধান পাওয়া যাবে। তিন দিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে এ সমস্যার কোনো সমাধান নেই এবং তারা বাড়ি ফিরে গেলেন। ১৮৯৮ সালে বিশেষজ্ঞরা যে সমস্যার কোনো সমাধান জানতেন না, সে সমস্যা মোটরচালিত যান আবিষ্কারের ফলে তিন দশকের মধ্যে সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেল। এ ঘটনা এ কথাই প্রমাণ করে যে কারিগরি পরিবর্তনের সম্ভাবনা অসীম।

নামে কী আসে যায়

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, নামের সঙ্গে মানুষের প্রকৃত অর্জনের কোনো সম্পর্ক নেই। ধরুন, নিউ ইয়র্ক শহরে রবার্ট লেনের পরিবারের কথা। কয়েকটি পুত্রসন্তানের জন্মের পর ১৯৫৮ সালে জন্ম নিল আরেকটি ছেলে। খুশি হয়ে বাপ ছেলের নাম দিলেন Winner Lane (বিজয়ী লেন)। এর কিছু দিন পর আরেকটি ছেলে হলো। বাপ এ ছেলের নাম রাখলেন Loser Lane (পরাজিত লেন)। নাম থেকে সবাই আশা করেছিল যে বিজয়ী লেন কেউকেটা হবে আর পরাজিত লেন থাকবে হতাশের আর নিষ্ফলের দলে। বাস্তব জীবনে দেখা গেল বিজয়ী লেন হলো অশিক্ষিত দাগি আসামি। আর পরাজিত লেন হলো উচ্চশিক্ষিত ডাকসাইটে পুলিশ কর্মকর্তা। সবাই আদর করে লুজারকে বলত লু। তাঁর পরাজিত (লুজার) নাম হারিয়ে গেল।

আরেকটি ঘটনা বিবেচনা করুন। নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে অলবনি শহরে পতিতাবৃত্তির দায়ে ছেনালি (Temptress) নামে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক রেগে বললেন, মেয়ের নাম ছেনালি রাখাতেই সে পতিতা হয়েছে। প্রকৃত দোষী তার মা, যিনি এ ধরনের নাম রেখেছেন। মাকে ডাকা হলো। মা বললেন, তাঁর মেয়ের নাম রাখা হয় একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের চরিত্র Tempest-এর নাম অনুসারে। Tempest নামের বানান না জানাতে স্কুলে তার নাম হয়ে যায় Temptress বা ছেনালি। নেহাত বানান ভুলে মেয়েটি পতিতা হয়ে গেল! এ মতের সমালোচকেরা অবশ্য বলবেন, নামের সঙ্গে পতিতাবৃত্তির কোনো সম্পর্ক নেই। এ মেয়ের নাম ছেনালি না রেখে সতী-সাবিত্রী রাখলেও সে পতিতা হতে পারত।

লেভিট ও ডুবনার জনপ্রিয় নামগুলোর সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য : শিশুদের নামের পরোক্ষ প্রভাব তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর পড়তে পারে। শিক্ষিত ও বিত্তবান পিতামাতাদের পছন্দের নামের তুলনায় অসচ্ছল ও অশিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের নাম ভিন্ন হয়। অশিক্ষিত ও অসচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা পরবর্তী জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারে না। যেমন ধরুন, মার্কিন সচ্ছল শ্বেতাঙ্গ পরিবারে পুরুষ বাচ্চাদের জনপ্রিয় নাম হচ্ছে : বেঞ্জামিন, স্যামুয়েল, জোনাথন, আলেকজান্ডার এবং অ্যান্ড্র। গরিব ঘরের শ্বেতাঙ্গ পুরুষ শিশুদের পছন্দের নাম হলো : কডি, ব্র্যান্ডন, এন্টোনি, জাস্টিন, রবার্ট। তাই বেঞ্জামিন নামের একটি লোক কডি নামের ব্যক্তির চেয়ে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর তা নামের অর্থের জন্য নয়; পিতা-মাতার আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানের ভিন্নতার জন্য।

গাড়ি চুরি রোধে বেতারতরঙ্গ প্রেরণ যন্ত্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৩.৬ কোটি গাড়ি, ১১ কোটি ট্রাক ও ১০ লাখ বাস রয়েছে। কাজেই গাড়ি বিক্রেতাদের মতো গাড়ি চোরদেরও সেখানে রমরমা ব্যবসা রয়েছে। বছরে প্রায় ১২ লাখ গাড়ি চুরি হয়। অথচ ২০০৮ সালে বাংলাদেশে গাড়ি, ট্যাক্সি ও জিপ মিলিয়ে মোট মোটরচালিত বাহন ছিল প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চোরাই গাড়ির ব্যবসা বাংলাদেশের মোট গাড়ি ব্যবসার প্রায় পাঁচ গুণ। গাড়ি চুরি রোধে প্রধানত দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কেউ কেউ গাড়িতে বেশ বড় ধরনের তালা লাগাত। এসব তালা ভাঙতে হাতুড়ি ব্যবহার করতে হয়। উপরন্তু এ ধরনের তালা ভাঙতে গেলে স্টিয়ারিং হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হতো, যার ফলে চোরাই গাড়ির দাম কমে যেত। দ্বিতীয়ত, কোনো কোনো গাড়িতে বিপদসংকেতের ঘণ্টা বা অ্যালার্ম লাগানো হতো। এই ঘণ্টা নিষ্ক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত চোরদের ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে এসব ব্যবস্থা সত্ত্বেও গাড়ি চুরি তেমন কমেনি। এর কারণ হলো, চোরাই গাড়ি কেনে গাড়ির ওয়ার্কশপ বা কারখানাগুলো। তালা বা অ্যালার্মের জন্য চোরের ঝুঁকি বেড়ে গেলেও তাতে ক্রেতা ওয়ার্কশপগুলোর কোনো অসুবিধা হয়নি। সম্প্রতি লোজেক (Lojack) নামে তাসের প্যাকেটের সমান রেডিও ট্রান্সমিটার (তরঙ্গ প্রেরণকারী) বাজারজাত করা হয়েছে। এই ট্রান্সমিটারটি অতি সহজে গাড়ির ভেতর লুকিয়ে রাখা যায়। লোজেকের তথ্যসহ পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে বেতার সংযোগের মাধ্যমে ট্রান্সমিটারটি চালু করে গাড়িটির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে ও গাড়িটি উদ্ধার করতে পারে। এর প্রথম লাভ হলো গাড়িটির যন্ত্রপাতি সরিয়ে গাড়িটির ক্ষতি করার আগেই গাড়িটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয় লাভ হয় সমাজের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চোরাই গাড়ি ওয়ার্কশপে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই অতি সহজেই চোরাই গাড়ির ক্রেতা-ওয়ার্কশপ ধরা সম্ভব হয়। যেহেতু লোজেক যন্ত্রটি ছোট এবং কোন গাড়িতে লোজেক লাগানো আছে তা জানা সহজ নয়, সেহেতু চোরাই ওয়ার্কশপগুলি সতর্ক হয়ে যায় এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা কম তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চোরাই গাড়ি রাখতে অস্বীকার করে। একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, কোনো শহরে ১ শতাংশ গাড়িতে লোজেক লাগালে গাড়ি চুরি প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়। এই অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, শুধু চোরদের পেছনে দৌড়িয়ে লাভ হবে না। বরং যারা চোরদের আশ্রয় দেয় তাদের ধরতে পারলে চুরি অনেক কমে যাবে। অবশ্য কোনো কোনো মোবাইল ফোন কোম্পানি বাংলাদেশে অনুরূপ যন্ত্র চালু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এতে বড় ধরনের সাফল্যের খবর পাওয়া যায়নি। যন্ত্র এক হলেও বাংলাদেশের চোর ও পুলিশ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সহকর্মীদের তুলনায় অধিকতর সেয়ানা।

ইতিহাসের সর্বাধিক শিশু অপহরণের ঘটনা

১৯৮৭ সালের ১৫ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজস্ব বিভাগের হিসাব থেকে ৭০ লাখ শিশু হারিয়ে যায়। মানুষের ইতিহাসে এর আগে কখনো এত শিশু হারিয়ে যাওয়ার নজির নেই। প্রচলিত নিয়মে শিশুদের জন্য কর রেয়াত দেওয়া হয়। যেকোনো করদাতা তাঁর করের বিবরণীতে শুধু শিশুর নাম লিখে করসুবিধা দাবি করতে পারতেন। রাজস্ব বিভাগের সন্দেহ হয় যে এ সুবিধার অপব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম করা হলো যে আয়কর বিবরণীতে প্রতিটি শিশুর সামাজিক নিরাপত্তা নিবন্ধনের তথ্য দিতে হবে। এ নিয়ম ১৯৮৭ সাল থেকে কার্যকর করা হয়। নতুন নিয়মের ফলে যারা নির্ভরশীল সন্তানদের সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছিলেন তারা ভুতুড়ে সব নাম বাদ দিয়ে দেন। দেখা গেল যে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের কথা বলে কর রেয়াতের দাবি ছিল ভুয়া। এ তথ্য থেকে এটাই প্রমাণিত হয়, ফাঁকি ধরার ও শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাই সরকারকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে।

সান্তা ক্লজের সঙ্গে মার্কিন পতিতাদের মিল

আপাতদৃষ্টিতে পতিতা ও সান্তা ক্লজের মধ্যে কোনো মিল নেই। সান্তা ক্লজ পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী। শিশুরা বিশ্বাস করে যে বড়দিনের রাত্রে যখন তারা ঘুমিয়ে থাকে তখন সান্তা চিমনি দিয়ে ঢুকে তাদের জন্য উপহারসামগ্রী রেখে যায়। যদিও সান্তা ক্লজের এ কাহিনি মিথ্যা, তবু এ আজগুবি কাহিনি নির্দোষ শিশুদের নির্মল আনন্দ প্রদান করে। প্রতিতুলনায় পতিতারা সমাজে অবক্ষয়ের সৃষ্টি করে। নৈতিক দিক থেকে পতিতা ও সান্তা ক্লজের অবস্থান বিপ্রতীপ মেরুতে। তবু লেভিট ও ডুবনার মনে করেন যে অর্থনৈতিক দিক থেকে সান্তা ক্লজ ও অনেক পতিতা অভিন্ন। উভয়েই খণ্ডকালীন শ্রমিক। বড়দিনের সময় সান্তা ক্লজ সাজা একটি অস্থায়ী খণ্ডকালীন চাকরি। উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলে সান্তা ক্লজের কাজ করার জন্য লোকের অভাব হয় না। তেমনি, বছরের কোনো সময় পতিতার চাহিদা বেড়ে গেলে পতিতার অভাব হয় না। এ প্রসঙ্গে লেভিট ও তার সহকর্মীদের শিকাগো শহরে ওয়াশিংটন পার্ক এলাকায় পতিতাদের সম্পর্কে সমীক্ষার তথ্যগুলি স্মরণ করা যেতে পারে। ওই এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাইয়ের সময় পতিতাদের চাহিদা বেড়ে যায়। এর কারণ হলো, প্রথাগতভাবে মার্কিনরা ৪ জুলাইয়ের সময় দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারের পুনর্মিলনীর জন্য ছুটে আসে। এভাবে শিকাগো শহরে বাইরে থেকে অনেক লোক আসে। তাই পতিতার চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। তবু জোগানের কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। অবশ্যই শিকাগো শহরের স্থায়ী পতিতারা এ সময় অনেক বাড়তি ব্যবসা করে। তবে শুধু স্থায়ী পতিতারা অতিরিক্ত সময় কাজ করে এ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয় না। কাজেই বড়দিনের সান্তা। ক্লজদের মতো অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। দেখা যাচ্ছে যে পতিতাবৃত্তিতে খণ্ডকালীন কর্মীর অভাব হয় না। লেভিট ও তাঁর সহকর্মীদের সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, যেসব গৃহবধূ সারা বছর সতী-সাধ্বীর জীবন যাপন করে থাকেন তাদের কেউ কেউ স্বাধীনতা দিবসের ছুটিকালে খণ্ডকালীন পতিতার কাজ করে দুপয়সা কামিয়ে নেন। চাহিদা কমে গেলে আবার তারা নিয়মিত জীবনে ফিরে যায়, যেমনি বড়দিনের শেষে সান্তা ক্লজের পোশাকধারী দোকানকর্মীরাও তাদের নিয়মিত জীবনে ফিরে যায়।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হাসে কৃত্রিম আগ্নেয়গিরি

লেভিট ও ডুবনার মনে করেন, সব জটিল সমস্যার অতি সহজ সমাধান আছে। তাঁরা তাঁদের এই আশাবাদ বিজ্ঞানের জটিল সমস্যা সমাধানে প্রয়োগ করতে চান। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিঃসন্দেহে একটি বড় সমস্যা। কিন্তু এর সমাধান তত জটিল নয়। তাঁরা মনে করেন যে জলবায়ুর ওপর আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের প্রভাব বিশ্লেষণ করলেই এ ক্ষেত্রে কী করণীয় তা সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব। ১৯৯১ সালে ফিলিপিনসে মাউন্ট পিনাটুবো (Mount Pinatubo) নামক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটে। এ ধরনের বিস্ফোরণের ফলে যে সালফার ডাই-অক্সাইড মহাশূন্যের দিকে উৎক্ষিপ্ত হয়, তার সবটুকুই পৃথিবীপৃষ্ঠে ফিরে আসে না। তার একটি অংশ জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মহাশূন্যে একটি আস্তরণ সৃষ্টি করে, যা সূর্যকিরণ প্রতিহত করে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠে উত্তাপ কিছুদিনের জন্য কমে যায়। মাউন্ট পিনাটুবো বিস্ফোরণের পর এক বছর পৃথিবীর তাপমাত্রা এক ডিগ্রি ফারেনহাইট কম ছিল। তাই, যদি নিয়মিতভাবে মহাশূন্যে সালফার ডাই-অক্সাইড নিক্ষেপ করা যায়, তবে বিশ্বের তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। সমস্যা হলো, মহাশূন্যে সালফার ডাই অক্সাইড কীভাবে নিয়মিত ছোঁড়া হবে? এ সম্পর্কেও লেভিট ও ডুবনারের সুপারিশ রয়েছে। তারা বলেছেন, যদি পৃথিবীর ওপরে ১৮ মাইল দীর্ঘ একটি হোসপাইপ শূন্যে ভাসমান বেলুন দিয়ে উড়িয়ে রাখা যায়, তবে এ পাইপের মাধ্যমে শূন্যে সালফার ডাই-অক্সাইড পাঠানো সম্ভব। অর্থাৎ সালফার ডাই অক্সাইড নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় হোসপাইপ বসানো গেলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। এতে মোট খরচ হবে ২৫০ মিলিয়ন ডলার।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে লেভিট ও ডুবনারের এই সুপারিশ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা অবশ্য কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাঁরা বলছেন যে কারিগরি দিক থেকে তাঁদের বক্তব্য আগাগোড়া ভুলে ভরা (এলিজাবেথ কলবার্ট, ২০০৯)। শূন্যে ভাসমান ১৮ মাইল দীর্ঘ হোসপাইপের সুপারিশ বাঙালি পাঠকদের রবীন্দ্রনাথের জুতা আবিষ্কারের কাহিনি মনে করিয়ে দেয় :

সকলে মিলি যুক্তি করি শেষে
কিনিল ঝটা সাড়ে-সতেরো লক্ষ,
ঝাঁটের চোটে পথের ধুলা এসে
ভরিয়া দিল রাজার মুখবক্ষ।
ধুলায় কেহ মেলিতে নারে চোখ,
ধুলার মেঘে পড়িল ঢাকা সূর্য,
ধুলার বেগে কাশিয়া মরে লোক,
ধুলার মাঝে নগর হল ঊহ্য।
কহিল রাজা, ‘করিতে ধুলা দূর
জগৎ হল ধুলায় ভরপুর!’

লেভিট আর ডুবনারের প্রস্তাবিত ১৮ মাইল লম্বা হোসপাইপ দিয়ে দুনিয়া ভরে দিলে সাড়ে-সতেরো লক্ষ ঝাঁটার মতো লঙ্কাকাণ্ডই ঘটবে। লেভিট আর ডুবনারের সব আজব তথ্য বাস্তব না হলেও তাঁদের বক্তব্য খুবই কৌতুকপ্রদ। তাদের আজগুবি তথ্যগুলির মধ্যে একটি বিশেষত্ব লক্ষণীয়। এঁরা আশাবাদী। তারা মনে করেন যে সব সমস্যারই অতি সহজ সমাধান রয়েছে। সহজ সমাধান খুঁজতে গিয়ে এঁদের বক্তব্য অনেক সময় আজব হয়ে গেছে।

৬. গতানুগতিক প্রজ্ঞার (Conventional Wisdom) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

আজব অর্থনীতি ও জবর-আজব অর্থনীতি বই দুটি পাঠককে আনন্দ ও জ্ঞান প্রদানের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। তবে যে জ্ঞান লেখকেরা পরিবেশন করতে চান তা গতানুগতিক জ্ঞান নয়। অর্থনীতিবিদ লেভিট এক অর্থে জন কেনেথ গলব্রেথ (John Kenneth Galbraith)-এর ভাবশিষ্য। গতানুগতিক প্রজ্ঞায় বা চিরাচরিত জ্ঞানে তার বিশ্বাস নেই। গতানুগতিক প্রজ্ঞা সব সময় সত্য নয়। সমাজজীবনে সত্য অত্যন্ত জটিল। তার সঠিক উপলব্ধি করতে হলে অনেক মানসিক পরিশ্রমের প্রয়োজন। এ পরিশ্রম এড়ানোর জন্য মানুষ গতানুগতিক প্রজ্ঞা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। গতানুগতিক প্রজ্ঞার ব্যাখ্যা হলো সহজ, সুবিধাজনক, স্বস্তিদায়ক ও চিন্তামুক্ত। গতানুগতিক প্রজ্ঞা আমাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে এবং আমাদের মনে কোনো উদ্বেগের সৃষ্টি হতে দেয় না। কিন্তু গতানুগতিক প্রজ্ঞায় সব সময় সত্য মেলে না। গতানুগতিক প্রজ্ঞার ঘেরাটোপে আমাদের মন বন্দী থাকায় আমরা বাস্তব জীবনের জটিলতা এড়িয়ে চলি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা বিশ্লেষণ সম্পর্কে লেভিট ও ডুবনারের বক্তব্য হলো : ‘People respond to incentives, although not necessarily in ways that are predictable or manifest. Therefore one of the most powerful laws of the universe is the law of unintended consequences.’ (মানুষ প্রণোদনায় সাড়া দেয়, তবে তা সব সময় নিশ্চিতভাবে বা দৃশ্যমানভাবে নয়। সুতরাং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি শক্তিশালী বিধি হলো অনভিপ্রেত পরিণামের সূত্র)। যে উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো কাজ করা হয়, ফলাফল তার সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক কালে অপরাধ-প্রবণতা হ্রাস সম্পর্কে তাদের বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার

যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধীরা গেল কোথায়?

সারণি ১.১-এ ১৯৬০ থেকে ২০০৯ সময়কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের মূল প্রবণতাগুলি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে তিন ধরনের অপরাধের হার দেখানো হয়েছে। প্রথমে রয়েছে সহিংস অপরাধের হার। সহিংস অপরাধের মধ্যে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও শারীরিক হামলা। দ্বিতীয়ত, খুনের হার দেখানো হয়েছে। তৃতীয়ত, সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধ (চুরি, গৃহে অনুপ্রবেশ, গাড়ি চুরি ও অগ্নিসংযোগ) দেখানো হয়েছে। অপরাধের হার প্রতি ১ লাখ লোকের ভিত্তিতে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

সারণি ১.১ থেকে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো বছর ওঠানামা সত্ত্বেও ১৯৬০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত সময়কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার অতি দ্রুত বেড়ে যায়। ১৯৯১ সালে সারণি ১.১-এ প্রদর্শিত তিন ধরনের অপরাধের হারই সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৬০ সালে প্রতি ১ লাখ লোকের মধ্যে গড়ে মাত্র ৫.১ জন খুন হয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে খুনের হার ছিল ৯.৮ (৯২ শতাংশ বৃদ্ধি)। প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় ১৯৬০ সালে সহিংস অপরাধের হার ছিল ১৬০.৯; এই হার ১৯৯১ সালে ৭৫৮.২-এ উন্নীত হয় (৪৭১ শতাংশ বৃদ্ধি)। সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধের হার ছিল ১৯৬০ সালে প্রতি লাখে ১৭২৬। ১৯৯১ সালে এ হার বেড়ে ৫১৪০-এ দাঁড়ায় (২৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি)। অপরাধের হার সবচেয়ে বাড়ে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অপরাধের হার ভবিষ্যতে আরও দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আতঙ্ক দেখা দেয়। একজন বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০-এর দশকে অপরাধ এত বাড়বে যে দেশটিতে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের হতবাক করে দিয়ে ১৯৯১ সালের পর অপরাধের হার হঠাৎ কমে যায়। অপরাধের এই নিম্নমুখী প্রবণতার দুটি বিশেষত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, অপরাধের হার যুক্তরাষ্ট্রের সব অঞ্চলে কমেছে। কথাটার তাৎপর্য হলো, এর কারণ কোনো বিশেষ অঞ্চলের নীতি বা উদ্যোগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। অপরাধ হ্রাসের এই রহস্য ব্যাখ্যা করতে হলে এমন উপাদান খুঁজতে হবে, যা সারা দেশে একই সঙ্গে কাজ করেছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে কমে গেলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তেমনটি ঘটেনি। এর সহজ অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেছে, যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ঘটেনি।

ইংরেজি একটি আপ্তবাক্যে বলা হয়েছে, সাফল্যের পিতৃত্বের দাবি অনেকেই করে, কিন্তু ব্যর্থতা হচ্ছে এতিম; ব্যর্থতার দায় কেউ নিতে রাজি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার বাড়ার দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলই নেয়নি। অথচ অপরাধ কমার পর সবাই দাবি করতে থাকেন যে তাঁদের অনুসৃত নীতির সাফল্যের জন্যই অপরাধ হ্রাস পেয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা জিগির তুলল, ক্লিনটন আমলে অর্থনীতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ফলেই অপরাধ কমেছে। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের দাবি নাকচ করে বলল যে, তাদের দল হিংস্র অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পুনঃপ্রবর্তন করায় এবং অপরাধীদের সাজার মেয়াদ বাড়ানোর ফলেই অপরাধ কমেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বললেন যে পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনমূলক পুলিশি টহলদারি ও তৎপরতার কারণে অপরাধের হার কমেছে। সমাজতাত্ত্বিকেরা দাবি করেন যে অপরাধ হ্রাসের প্রবণতার উৎস খুঁজতে হবে জনসংখ্যার পরিবর্তনে ও অন্যান্য সমাজতাত্ত্বিক উপাদানের মিথস্ক্রিয়াতে (interaction)। লেভিট (২০০৪) যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ হ্রাসের প্রবণতা সম্পর্কে একটি সাড়া-জাগানো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন Journal of Economic Perspectives সাময়িকীতে। লেভিটের মূল বক্তব্যগুলি নিম্নে সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করা হলো :

• রমরমা অর্থনীতি : ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন অর্থনীতিতে তেজি অবস্থা। বিরাজ করায় এবং বেকারত্বের হার কমায় অপরাধ কমেনি। প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, যখন তেজি ভাব কেটে যায় এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় তখন অপরাধের হার বাড়ে না। লেভিটের এ বক্তব্যের ভিত্তি হলো ১৯৫০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অপরাধের হার ও অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ। পরবর্তীকালের অপরাধ-সম্পর্কিত উপাত্ত লেভিটের অনুমান সমর্থন করে। বস্তুত, ২০০১ থেকে ২০০৯ সময়কালে অপরাধের হার সারণি ১.১ দেখা যাবে। এ সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০০১-২০০৯ সময়কালেও অপরাধের হার কমে চলেছে। ২০০৭-২০০৯ সময়কালে একটি বড় আকারের মন্দা দেখা দিলেও অপরাধের হার বাড়েনি।

• অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন : অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর আইন প্রবর্তনের ফলে অপরাধের হার কমেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র ক্রয়ের ওপর কার্যত কোনো বাধানিষেধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের হাতে ২০ কোটি বন্দুক রয়েছে। মোট প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যার তুলনায় বন্দুকের সংখ্যা বেশি। কিন্তু আজব বিষয় এই যে, বন্দুকের এত ছড়াছড়ি সত্ত্বেও ৮০ শতাংশ অপরাধী আইনসম্মত পদ্ধতিতে বন্দুক সংগ্রহ করেনি। কাজেই অস্ত্র ক্রয়ের আইন পরিবর্তন করলেই অপরাধ কমবে না। শিকাগো শহরে ১৯৮২ সালে অস্ত্র বিক্রয়ের ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শিকাগো শহর কোনো লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেনি।

• মৃত্যুদণ্ডের হার বৃদ্ধি : অপরাধ দমনে এ ব্যবস্থা মোটেও কার্যকর হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে মোট ১১৭ জন অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে ৪৭৮ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। অর্থাৎ ১৯৯০-এর দশকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু অপরাধ-পরিস্থিতির ওপর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদৌ কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, সে সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। ২০০১ সালে মাত্র ৬৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। খুনের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সম্ভাব্যতার হার রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হারের চেয়ে অনেক কম। কাজেই মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে অপরাধ লক্ষণীয়ভাবে কমবে, এ অনুমান মোটেও সঠিক নয়।

• লুকিয়ে অস্ত্র বহনের অনুমতি : এই আইনের প্রধান যুক্তি ছিল যে অপরাধের সম্ভাব্য শিকারেরা যদি লুকিয়ে অস্ত্র বহন করে, তবে অপরাধীরা জানতে পারবে না যে তার সম্ভাব্য শিকারের কাছে অস্ত্র রয়েছে কি না। কাজেই অপরাধীরা আক্রমণ করতে ভয় পাবে এবং এর ফলে অপরাধের হার কমে যাবে। এ অনুমানও সঠিক প্রমাণিত হয়নি।

• যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যায় প্রবীণদের প্রাধান্য : ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস পাওয়ায় জনসংখ্যায় প্রবীণদের (৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক) অনুপাত বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের প্রবীণদের সহিংস অপরাধ করার প্রবণতা কিশোর-অপরাধের ৫০ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। আবার অপরাধীরা যত সহজে শিশু-কিশোরদের আক্রমণ করে তত সহজে প্রবীণদের আক্রমণ করতে সাহস পায় না। তাই জনসংখ্যায় প্রবীণদের অনুপাত বাড়লে অপরাধের হার হ্রাস পেতে পারে। তবে লেভিট মনে করেন, দুটি কারণে বিংশ শতকের সর্বশেষ দশকে জনসংখ্যায় প্রবীণদের অনুপাত বৃদ্ধিকে যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার হ্রাসের একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। প্রথমত, জনসংখ্যায় শিশু-কিশোরদের অনুপাত কমলেও মোট শিশু-কিশোরের সংখ্যা বেড়েছে। কাজেই অন্য সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলে এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ বাড়ার কথা। একই সঙ্গে এ সময় জনসংখ্যায় কৃষ্ণাঙ্গদের অনুপাত বেড়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি। এ দুটি কারণে জনসংখ্যার বয়স-ভিত্তিক বিন্যাসে (age-distribution) পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার কমানোতে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি।

• পুলিশ-ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনশীল কৌশল : অনেক পুলিশ কর্মকর্তা অভিমত পোষণ করেন যে পুলিশ-ব্যবস্থাপনায় নতুন কার্যক্রম অপরাধ হ্রাসে খুবই কার্যকর অবদান রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ নিউ ইয়র্ক শহরের পুলিশের অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে। অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় নিউ ইয়র্ক শহরে একসময় ছোটখাটো অপরাধ আমলে নেওয়া পুলিশ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে দেখা যায় যে অপরাধের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছোটখাটো অপরাধ যারা করে, তারাই পরবর্তীকালে বড় অপরাধ করে। ছিঁচকে অপরাধীদের ধরা শুরু হলে অপরাধের হার কমে যায়। তবে নিউ ইয়র্ক শহরের ক্ষেত্রে এ অনুমান কতটুকু সত্য, সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯৯১ সাল থেকে অপরাধের হার কমতে থাকে। অথচ পুলিশের উদ্ভাবনশীল কর্মসূচিগুলি চালু হয় ১৯৯৩ সালের পর। দ্বিতীয়ত, যেসব শহরে নিউ ইয়র্কের মতো উদ্ভাবনশীল কর্মসূচি নেওয়া হয়নি, সেসব শহরেও নিউ ইয়র্ক শহরের মতো অপরাধের হার কমে আসে।

• পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি: ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের সংখ্যা ১৪ শতাংশ বাড়ানো হয়। অনেকে দাবি করেন যে এর ফলেই এই দশকে অপরাধের হার কমে আসে। অবশ্যই পুলিশের সংখ্যা বাড়ালে অপরাধ করা শক্ত হয়ে পড়ে। তবু সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে সহিংস অপরাধের ওপর পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব প্রমাণ করা অত্যন্ত দুরূহ। একদিকে অপরাধ বাড়ছে, অন্যদিকে পুলিশের সংখ্যা বাড়ছে। কালীন (time series) উপাত্তের ভিত্তিতে পুলিশের সংখ্যা ও অপরাধের হার বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যাবে, বড় অপরাধের হারের সঙ্গে পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধির ধনাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। আসলে অপরাধের ওপর পুলিশের সংখ্যা বাড়ানোর ফল বিশ্লেষণ করতে হলে একই সময়ে যেসব শহরে পুলিশের সংখ্যা বেড়েছে আর যেসব শহরে পুলিশের সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে, তাদের অপরাধের হারের তুলনা করতে হবে। সারা দেশে অপরাধের মাত্রার ওপর পুলিশের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধির প্রভাব নির্ণয় করা অত্যন্ত শক্ত। লেভিটের গবেষণা হতে দেখা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ এর দশকে যে অপরাধ কমে আসে, তার ১০ শতাংশ পুলিশের সংখ্যাবৃদ্ধির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

• কারাগারে আটক অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধি : ১৯৫০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১ লাখ নাগরিকের মধ্যে ১০৫ জন কারায় অন্তরীণ ছিল। ২০০০ সালে এই হার ৪৯০-এ উন্নীত হয়। অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাত হিসাবে কারাগারে আবদ্ধ লোকের হার চার গুণের বেশি বাড়ে। এর একটি বড় কারণ হলো, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে সাজা দানের হার বাড়ানো হয় এবং জনমতের চাপে বিচারকেরা সাজার পরিমাণও বাড়িয়ে দেন। অপরাধীরা জেলে আটক থাকায় অপরাধ কমে যায়। আবার সাজার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় জেলের বাইরে যেসব অপরাধী ছিল তারা সতর্ক হয়ে যায়। ফলে অপরাধের হার কমে যায়। এতে ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন মুলুকে যে হারে অপরাধ কমে আসে তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যাখ্যা করা যায়।

• মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ে পরিবর্তন : ১৯৮৫-এর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ে দুটি পরিবর্তন দেখা যায়। একটি কারিগরি ও অন্যটি অর্থনৈতিক। তখন পর্যন্ত কোকেন ছিল নেশার প্রধান সামগ্রী। ১৯৮৫ এর দিকে একটি নতুন পদ্ধতি চালু হলো। এ পদ্ধতিতে বেকিং সোডার সঙ্গে সামান্য কোকেন মিশিয়ে গরম করলে আরও অনেক শক্তিশালী নেশার সামগ্রী উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এর নাম দেওয়া হয় ক্র্যাক (Crack)। যেহেতু ক্র্যাকে কোকেন (যা বেআইনি ও তাই দামি) কম লাগে, তাই এর দাম কমে যায়। অর্থনৈতিক সূত্র অনুসারে উন্নত কোকেনের মানের এ পণ্যের দাম কমে গেলে তার চাহিদা বেড়ে যায়। এর ফলে ক্র্যাক কোকেনের চেয়েও লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত হয়। প্রথম পর্যায়ে ক্র্যাক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই দ্বন্দ্বে অনেক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়। মার্কিন মুলুকে খুনের হার বেড়ে যায়। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাওয়াতে ক্র্যাকের দাম কমতেই থাকে। এর ফলে লাভ কমে যায়। ক্র্যাক ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা কমে যায়। খুনাখুনিও কমে যায়। ১৯৯০-এর দশকে মাদক ব্যবসায়ের এসব পরিবর্তনের ফলে খুনের হার কমে যায়। তবে সম্পত্তি-সংক্রান্ত ও অন্যান্য সহিংস অপরাধ হ্রাসে এর ভূমিকা সীমিত।

এই সুদীর্ঘ বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে মার্কিন মুলুকে অপরাধ হ্রাস সম্পর্কে যেসব প্রতর্ক তুলে ধরা হয়েছে তার বেশির ভাগই ভিত্তিহীন। পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি, মাদকদ্রব্যের অপ্রত্যাশিত মূল্যহ্রাসের ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে খুনাখুনি কমে যাওয়া এবং অপরাধীদের কারাবাসের সম্ভাবনা ও মেয়াদ বেড়ে যাওয়া অপরাধ হ্রাসে সহায়তা করেছে। কিন্তু অপরাধের হার গত শতকের নব্বইয়ের দশকে হঠাৎ কমে যাওয়ার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এতে পাওয়া যাচ্ছে না।

২০০১ সালে জন ডনোহু (John Donohue)-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে লিখিত এক প্রবন্ধে লেভিট দাবি করেন যে নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার কমার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক গর্ভপাত বৈধকরণ। আদালতের এ সিদ্ধান্তের আগে যুক্তরাষ্ট্রে গুটি কয়েক অঙ্গরাজ্য ছাড়া গর্ভপাত নিষিদ্ধ ছিল। এর ফলে বাপ-মা যেসব সন্তান চাইতেন না, তাদের জন্ম নিরোধ করা সম্ভব ছিল না। এ ধরনের বাপে খেদানো মায়ে-তাড়ানো অবাঞ্ছিত সন্তানেরাই কিশোর অপরাধী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত। গর্ভপাত বৈধ বলে স্বীকৃত হওয়ার ফলে এ ধরনের অপরাধীর সংখ্যা কমে যায়।

লেভিটের বক্তব্য অনুধাবনের জন্য গর্ভপাত সম্পর্কে কতিপয় তথ্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রো বনাম ওয়েড মামলায় (Roe versus Wade) গর্ভপাতকে বৈধ ঘোষণার পর প্রথম বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সাড়ে সাত লাখ গর্ভপাত ঘটে। ১৯৮০ সালে এই সংখ্যা ১৬ লাখে উন্নীত হয়। ১৯৯০-এর দশকে মোট গর্ভপাতের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসে। ২০০৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখের সামান্য ওপরে। প্রতি পাঁচটি গর্ভপাতের চারটি গর্ভপাতই ঘটে কৃষ্ণাঙ্গ মায়েদের ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কালোদের মধ্যে অপরাধ-প্রবণতা অনেক বেশি। যদি ধরে নিই যে গর্ভপাত না হলে প্রতিবছর যে লাখ লাখ অবাঞ্ছিত ও অবৈধ সন্তান জন্ম নিত, তাদের মধ্যে প্রতিবছর ১ লাখ শিশু ১৬ বছর বয়স থেকে পেশাগত অপরাধী হয়ে যেত, তাহলে সোজা অঙ্কের হিসাবে দেখা যায় যে গর্ভপাতের বৈধ সুযোগ সৃষ্টির ফলে কমপক্ষে ২২ লাখ অপরাধী জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

অপরাধের ওপর গর্ভপাতের প্রভাব সম্পর্কে লেভিটের যুক্তি অত্যন্ত সহজ। কিন্তু এ বক্তব্য প্রমাণ করা সহজ নয়। লেভিট ও ডনোহু তাঁদের প্রতর্কের সমর্থনে তিন ধরনের প্রমাণ পেশ করেন।

প্রথমত, অপরাধের ওপর গর্ভপাতের প্রভাব গর্ভপাত বৈধকরণের ১৫ থেকে পঁচিশ বছর (এই বয়সের অবাঞ্ছিত সন্তানদের অপরাধী হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি) পর দেখা যাবে এবং এই প্রভাব অনেক দিন ধরে চলবে। বাস্তবে তা-ই ঘটেছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০ বছর ধরে মার্কিন মুলুকে অপরাধের হার কমেই চলেছে। যদি কোনো বিশেষ ব্যবস্থার ফলে অপরাধ কমত তবে তার প্রভাব এক বছর-দুবছর পর দেখা দিত এবং এর প্রভাব কিছুদিন পর নিঃশেষিত হয়ে যেত। কোনো বিশেষ সংস্কারের প্রভাব ১৫/২০ বছর পর দেখা যেত না এবং প্রভাবটা দীর্ঘদিন ধরে অনুভূতও হতো না।

দ্বিতীয়ত, ১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাত বৈধকরণের কয়েক বছর আগেই নিউ ইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে আইন করে গর্ভপাত বৈধ করা হয়। এসব রাজ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যের আগে অপরাধের হার কমতে শুরু করে। এতে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে অবাঞ্ছিত সন্তান জন্মের হার কমে গেলে অপরাধের হারও হ্রাস পায়।

তৃতীয়ত, রাজ্যভেদে গর্ভপাতের হারের তারতম্য রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে যেসব রাজ্যে গর্ভপাতের হার বেশি ছিল সেসব রাজ্যে ১৯৯০-এর দশকে অপরাধের হার অপেক্ষাকৃত বেশি কমেছে।

এই গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে অনেক ঘটনার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল তাৎক্ষণিক ফলাফল থেকে ভিন্ন হতে পারে। গর্ভপাত বৈধকরণের প্রধান যুক্তি ছিল সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে মায়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। বৈধ গর্ভপাতের সুযোগ না থাকলে অনেক কুমারী মা বিপজ্জনক ও বেআইনি গর্ভপাতের চেষ্টা করত। এর ফলে কেউ কেউ মারা যেত এবং কেউ কেউ শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ত। গর্ভপাত বৈধকরণের ফলে অপরাধের হার কমে যাবে–এ ধরনের দাবি গর্ভপাত অধিকারের বড় সমর্থকেরাও করেননি। অথচ বাস্তবে তা-ই ঘটল। এই ধরনের অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিকে অভিপ্রেতের অতিরিক্ত প্রভাবের সূত্র (Law of Unintended Consequences) বলা হয়ে থাকে।

৭. সামগ্রিক মূল্যায়ন

ওপরের আলোচনায় বই দুটির বক্তব্য সম্পর্কে আভাস দেওয়া হলো মাত্র । স্বল্প-পরিসরের কোনো নিবন্ধে লেভিট ও ডুবনারের সব বক্তব্যের সারসংক্ষেপ। পেশ করা সম্ভব নয়। বই দুটি পড়লে আরও অনেক তথ্য জানা যাবে। তবু ওপরের আলোচনা থেকে এ দুটি বইয়ের কয়েকটি আকর্ষণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, এ দুটি বইয়ে অনেক বিষয় নিয়ে অত্যন্ত মনোগ্রাহী আলোচনা করা হয়েছে, যার অনেক তথ্যই সাধারণ পাঠকের জন্য সম্পূর্ণ নতুন। বই দুটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য। দ্বিতীয়ত, এ দুটি বইয়ে লেভিট ও ডুবনার অত্যন্ত আশাবাদী। তারা বিশ্বাস করেন যে, সব অর্থনৈতিক সমস্যারই সহজ সমাধান রয়েছে। তাদের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম তাই The Fix is in– And it’s Cheap and Simple’ (সমাধান আছে এবং তা সস্তা ও সহজ)। এই আশাবাদও পাঠকদের অতি সহজে আকৃষ্ট করবে। সবশেষে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সমর্থনে যথেষ্ট তথ্য ও উপাত্ত পেশ করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য সহজে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

পদ্ধতিগত দিক থেকে অবশ্য বই দুটির কয়েকটি দুর্বলতা রয়েছে। এই বই দুটির লেখকদের সংখ্যাতত্ত্বের ওপর প্রচণ্ড আস্থা রয়েছে। কাজেই তারা সংখ্যাতত্ত্বের দুর্বলতাগুলি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। প্রথমত, এঁরা কার্যকরণ (Causation) ও সহগমনের (correlation) মধ্যে পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে গুলিয়ে ফেলেছেন। কার্যকারণের তাৎপর্য হলো একটি কর্মের ফলে আরেকটি কর্ম ঘটে। যেমন ধূমপানের ফলে ক্যানসার হয়। এর ফলে ধূমপান ও ক্যানসারের মধ্যে সহগমন দেখা যায়। কিন্তু সহগমন হলেই কার্যকরণ প্রতিষ্ঠিত হয় না।

দ্বিতীয়ত, লেভিট ও ডুবনারের অনেক বক্তব্যই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পদ্ধতির দিক থেকে বিচারকদের সাথে সংখ্যাতত্ত্ববিদদের একটি বড় মিল রয়েছে। বিচারকেরা যদি অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ না করেন, তবে নির্দোষ ব্যক্তির দণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। আবার অন্যদিকে যদি বিচারক অপরাধের সন্দেহাতীত প্রমাণ চান, তবে অনেক সত্যিকারের অপরাধীকেও শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয় না; কেননা, সন্দেহের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা ছাড়া পেয়ে যায়। সংখ্যাতত্ত্বেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। যদি সন্দেহাতীতভাবে কোনো সূত্র প্রমাণ করতে হয়, তবে সম্ভাব্যতার মাত্রা ১০০% হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামান্য সন্দেহ দেখা দিলেই অনেক সত্য বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করতে হয়। সংখ্যাতত্ত্বে এ ধরনের ত্রুটিকে পয়লা কিসিমের গলতি বা Type 1 error বলা হয়ে থাকে। যেখানে প্রতিপাদ্য বক্তব্য সঠিক কিন্তু সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয় না বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে, সেখানেই পয়লা কিসিমের গলতি ঘটে। অন্যদিকে যদি প্রতিপাদ্য বক্তব্য আসলে মিথ্যা হয় অথচ সম্ভাব্যতার মাপকাঠি নিম্ন পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়, তবে অনেক মিথ্যা বক্তব্যও সত্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের ভ্রান্তিকে দোসরা কিসিমের গলতি (Type 2 error) বলা হয়ে থাকে। লেভিট ও ডুবনারের সমর্থকেরা দাবি করেন যে এ ধরনের সমস্যা সংখ্যাতত্ত্বে স্বাভাবিক এবং এসব ঝুঁকি সত্ত্বেও বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই সংখ্যাতত্ত্বের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। এ ধরনের ত্রুটি সংশোধনের জন্য বিভিন্ন সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতিও রয়েছে। কাজেই এ ধরনের দুর্বলতা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। আসলে লেভিট ও ডুবনারের পদ্ধতিগত সমস্যাটি আরও অনেক জটিল হতে পারে। লেভিট ও ডুবনারের বিশ্লেষণের ঝুঁকি শুধু পয়লা ও দোসরা কিসিমের গলতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এখানে তৃতীয় প্রকৃতির ত্রুটিরও আশঙ্কা রয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বের ভাষায় একে তিসরা কিসিমের গলতি বা Type 3 error বলা হয়ে থাকে। এই ত্রুটি তখনই ঘটে, যখন ভুল কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রতিপাদ্য বক্তব্য ত্রুটিপূর্ণ হলে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এ ধরনের বিপত্তি ঘটতে পারে। লেভিট ও ডুবনার অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের অনভিপ্রেত পরিণামের ওপর জোর দিয়েছেন। এ ধরনের বিশ্লেষণে তিসরা কিসিমের গলতির আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সমর্থনই যথেষ্ট নয়, গ্রহণযোগ্য বক্তব্যের সুস্পষ্ট কার্যকরণও ব্যাখ্যা করতে হবে। যারা লেভিট ও ডুবনারকে অনুসরণ করতে চান, তাদের এসব পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কথা মনে রাখতে হবে।

তৃতীয়ত, সমালোচকেরা লেভিট ও ডুবনারের পদ্ধতির সঙ্গে মোটেও একমত নন। জন ডিনারডো (২০০৭) লেভিট ও ডুবনারের গবেষণাকে ‘বিনোদন’ (entertainment) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মনে করেন যে শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে লেভিট ও ডুবনারের উত্থাপিত প্রশ্নগুলির জবাব দেওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন RCT (Randomized Control Trials) বা দৈবচয়নভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষণ। সমীক্ষার জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত এ দুই গোষ্ঠীতে ভাগ করতে হবে। নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন প্রবর্তন করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং ফলাফল সমরূপ অনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করতে হবে। লেভিট ও ডুবনার এ ধরনের পরীক্ষা করেননি। তাই তাদের ব্যবহৃত পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়।

চতুর্থত, লেভিট ও ডুবনার দেখিয়েছেন যে অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখা যায়। এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ফলাফলের একটি বড় কারণ হলো অজ্ঞতা। আর. কে. মার্টন (১৯৩৬) যথার্থই লিখেছেন, ‘In other words, “chance consequences” are those which are occasioned by the interplay of forces and circumstances which are so complex and numerous that prediction of them is beyond our reach’ (অন্যভাবে বলতে গেলে দৈবাৎ পরিণামগুলি এমন ধরনের জটিল ও অসংখ্য শক্তি ও পরিস্থিতির মিথস্ক্রিয়াতে ঘটে, যার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের আয়ত্তের বাইরে)। কাজেই এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিণামের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক বিতর্ক চলবে।

সবশেষে সমাজতাত্ত্বিক সমালোচকেরা মনে করেন, লেভিটের ও ডুবনারের মতো অর্থনীতিবিদেরা ধরে নেন যে মানুষ সব সময়ই যুক্তিশীল। বাস্তব জীবনে মানুষ এত চালাক ও যুক্তিবাদী হয় না। সাধারণ মানুষ যে রকম চিন্তা করে, সে রকম চিন্তা করতে না পারলে বিশ্লেষণ অবাস্তব ও অপূর্ণাঙ্গ থাকবে। এ সম্পর্কে স্যামুয়েলসন একটি সুন্দর গল্প বলেছেন। গল্পটি একজন চাষির সম্পর্কে। চাষির একমাত্র গাধাটি হারিয়ে যায়। চাষি সারা দিন গাধাটিকে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তার সন্ধান পাওয়া যায় না। রাতে গাধার শোকে চাষির ঘুম আসছিল না। চাষি ভাবছিল, সে কেন গাধাটি খুঁজে পেল না। সে মনে মনে চিন্তা করল, নিজে যদি গাধা হতো তবে সে কোথায় যেত। সে মনে মনে ভাবল, সে নিজে গাধা হলে স্কুলঘরের বারান্দায় শুয়ে থাকত। এই কথা মনে হওয়ামাত্রই চাষি স্কুলঘরের বারান্দায় ছুটে গিয়ে দেখে যে গাধাটি সত্যি সত্যি সেখানে শুয়ে আছে। স্যামুয়েলসন তাই বলতেন যে গাধা পেতে হলে গাধার মতো চিন্তা করতে হবে। লেভিট ও ডুবনারের বই পড়লে মনে হয় যে এরা সব সময় সপ্রতিভ ও যুক্তিশীল মানুষের মতো চিন্তা করেছেন, গাধার মতো চিন্তা করেননি। তাঁদের পদ্ধতি অনুসরণ করে তাই অনেক সময় হারানো গাধা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

.

উল্লেখিত রচনাবলি (Works Cited)

কলবার্ট, এলিজাবেথ (Kolbert, Elizabeth)। ২০০৯। Hose’. The New Yoker. November 16, 2009.

ডনোহু, জন ও স্টিভেন লেভিট (Donohue, John and Steven Levitt)। ২০০১। ‘Legalized Abortion and Crime’ Quarterly Journal of Economics. 116:2, 379-420.

ডিনারডো, জন (Dinardo, John)। ২০০৭। Interesting Questions in “Freakonomics”. The Journal of Economic Literature. Vol. 45, No-4 (Dec, 2007), 973-1000..

বেকার, গ্যারি এস (Becker, Gary S)। ১৯৯২। The Economic Way of Looking at life’. Nobel Memorial Lecture. Stockholm: Nobel Foundation.

লেভিট, স্টিভেন ডি (Levitt, Steven D.)। ২০০৪। Understanding Why Crime Fell in the 1990s: Four Factors That Explain the Decline and Six that Do Not. Journal of Economic Perspectives. Vol. 18. No.1 (Winter 2004), 163-190.

লেভিট, স্টিভেন ডি ও স্টিফেন যে ডুবনার (Levitt, Steven D. and Stephen J. Dubner)। ২০০৫। Freakonomics. New York: Harper Collins.– Ipood, Super Freakonomics. New York: Harper Collins.

দ্য নেম অব দ্য গেম ইজ অ্যা কিডন্যাপিং – কেইগো হিগাশিনো

 লেখক: 

অনুবাদ : বিমুগ্ধ সরকার রক্তিম
ভূমিপ্রকাশের পক্ষে জাকির হোসেন কর্তৃক প্রকাশিত
প্রথম প্রকাশ: আশ্বিন ১৪২৭, সেপ্টেম্বর ২০২০
প্রচ্ছদ: সজল চৌধুরী
অলংকরণ ও অক্ষরবিন্যাস: ভূমি ডেস্ক
বানান সংশোধন ও বর্ণ অলংকরণ: জাকির হোসেন, সজল চৌধুরী

.

অনুবাদকের উৎসর্গ

নিজেকে।
রক্তিম, তুমি বাবা অনেক খেটেছ বইটার পেছনে।
তাই তোমাকেই বইটা উৎসর্গ করে দিলাম।

.

অনুবাদকের কিছু কথা

প্রত্যেকটা বই অনুবাদ শেষে এই অংশটা লিখতে খুব ভালো লাগে আমার। অনেকেই এই অংশটা ঘটা করে লিখে থাকে, অনেকে এটা ছুঁয়েও দেখে না। আমার কাছে এটা কিন্তু বেশ উল্লেখযোগ্য একটা ব্যাপার বলে মনে হয়। বইটার কাজ করতে করতে কোনো মজার কিংবা দুর্ঘটনার কথা জানা যায়, লেখাটা সম্পর্কে লেখক/অনুবাদকের মতামত পাওয়া যায়, ব্যতিক্রমী অনেক কিছু জানাও যায়।

সবার আগে একটা কথা পরিষ্কার করি। আমি নেট ঘাঁটাঘাঁটি করে, জাপানিজ কাঞ্জিতে লেখকের নামটা পড়ে যা বুঝলাম, লেখকের নাম কেইগো হিগাশিনো। কিয়েগো হিগাশিনো নামেই এ দেশে তিনি পরিচিত ঠিক আছে, তবে কেইগোটাই সঠিক। যাক, ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দিলাম। তাই নামটা দেখে আশা করি আজ থেকে সঠিক নামেই ডাকা হবে (অবশ্য সেটা আপনার ব্যাপার, তবে সঠিকটা জেনে রাখা ভালো)।

আমি প্রথম যখন অনুবাদ শুরু করি (২০১৯ সালে), কেইগো হিগাশিনোর একটা বই অনুবাদ করা শুরু করেছিলাম। তবে অপ্রত্যাশিত কারণবশত সেটা বাদ দিতে হয়। তবে মনে মনে আশা রেখেছিলাম, তাঁর লেখা একটা বইয়ের অনুবাদ আমি একদিন করবোই। এই কোয়ারেন্টাইনে সুযোগ পেয়ে এই বইটা করে ফেলে সে আশাটা পূরণ করে ফেললাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, শেষ না করে কাউকে জানাবো না এবার। তবে তিন চাপ্টার শেষ করে শুধু রুদ্র কায়সার ভাইকে জানিয়েছিলাম। তিনিও বলে দিয়েছিলেন, শেষ করে নাও আগে। ইচ্ছা আছে, যেসব কাজ জাপানিজ থেকে এখনো ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়নি, সেগুলোতেও একদিন হাত দেবো! ইতোমধ্যে সে স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছি।

ওহ হ্যাঁ, আরেকটা কথা। যেহেতু অনুবাদটা আপাতত শখের কাজ হিসেবে ধরে নিয়েছি, সেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছি জাপানিজ কাজগুলোতেই বেশি প্রাধান্য দেবো। অন্য কাজ করব না তা কিন্তু নয়, তবে জাপানিজ

কাজের প্রাধান্য বেশি থাকবে। এ দেশের পাঠকদের সাথে আমি জাপানিজ আন্ডাররেটেড কিন্তু অসাধারণ বইগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

ও হ্যাঁ, একটা কথা চুপিচুপি জানিয়ে রাখি— অনুবাদ কী করব না করব, তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা কিন্তু সম্পূর্ণই আমার। এ জন্য আমি ভূমিপ্রকাশের জাকির ভাই, সজল ভাই আর রুদ্র ভাইয়ের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। কোনো কাজ জোর করে চাপিয়ে দিলে আমার সেটার প্রতি আগ্রহ অনেক কমে যায়। তাদের ও ভূমির সাথে জড়িত সবার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

এই বইয়ের ভেতর ব্যবহৃত জাপানিজ শব্দগুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। আশা করছি আমার এই চেষ্টাটা ফলপ্রসূ হবে, আপনারা স্বচ্ছন্দে বইটা পড়তে পারবেন। আর আমি এই অনুবাদের দুনিয়ায় খুব বেশিদিন হয়নি প্রবেশ করেছি, তাই আমার কাজে অনেক ছোটোখাটো ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। সে জন্য আগে থেকেই ক্ষমাপ্রার্থী।

বিমুগ্ধ সরকার রক্তিম
১১/৭/২০২০

আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি – আকবর আলি খান

প্রথম প্রকাশ: পৌষ ১৪১৯, জানুয়ারি ২০১৩

প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন। ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫, বাংলাদেশ

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী; সহযোগী শিল্পী : অশোক কর্মকার



উৎসর্গ


আমার পরম স্নেহের ছোট ভাই

জি এম জিয়াউদ্দিন খান

কবীর উদ্দিন খান

এবং

তাঁদের সহধর্মিণী

মাকসুদা খান

আনোয়ারা খান

.


ভূমিকা


বিংশ শতাব্দী অর্থনীতির দিগ্বিজয়ের যুগ। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও অর্থনীতি ছিল সমাজবিজ্ঞানের দুয়োরানি। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উনবিংশ শতাব্দীর বুদ্ধিজীবী কার্লাইল অর্থনীতির নাম দিয়েছিলেন dismal science বা হতাশাগ্রস্ত বিজ্ঞান। রিকার্ডো ও ম্যালথুসের ভুবনে অর্থনীতির লৌহকঠিন নিগড়ে শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রায় অগ্রগতির স্বপ্ন ছিল একটি আলেয়া। এমনকি উৎপাদনশীলতার নাটকীয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা উপলব্ধি সত্ত্বেও কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদীব্যবস্থার ধ্বংসের দুঃস্বপ্নে ছিলেন বিভোর। বিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদেরাই প্রথম মানুষের অপরিসীম অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরেন এবং ব্যাস্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির প্রহেলিকাসমূহের সমাধানের উদ্যোগ নেন। বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে মাথাপিছু আয়ের অব্যাহত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি সমাজবিজ্ঞানে সম্রাজ্ঞীর আসনে অধিষ্ঠিত হলো। অর্থনীতি শুধু রুটি-রোজগারের ও চাহিদা-জোগানের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকল না। অর্থনৈতিক পদ্ধতি সব ধরনের সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণে ছড়িয়ে পড়ল। এতেই শুরু হলো অর্থনীতির দিগ্বিজয়।


নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের অবদানের ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করলে এ পরিবর্তনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য নোবেল স্মারক পুরস্কার প্রদান শুরু করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ৪৪ বার এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। একই পুরস্কার একাধিক ব্যক্তিকে দেওয়ার ফলে এখন পর্যন্ত ৭১ জন সমাজবিজ্ঞানী অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে ১২ জন রয়েছেন, যারা অর্থনৈতিক সূত্র অর্থনীতির বাইরে অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানে প্রয়োগ করেছেন অথবা অর্থনীতির সঙ্গে অন্য সমাজবিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এদের মধ্যে চারজন আদৌ অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। হারবার্ট এ সাইমন ছিলেন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, ড্যানিয়েল ক্যায়নেম্যান একজন মনস্তত্ত্ববিদ, রবার্ট আউম্যান হচ্ছেন গণিত বিশারদ ও এলিনর অস্ট্রম ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। রবার্ট ফগেল ও ডগলাস নর্থ ইতিহাসে অর্থনৈতিক তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ করেছেন; সমাজতাত্ত্বিক সমস্যা বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদ গ্যারি এস বেকার অসাধারণ সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন; অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন রবার্ট আউম্যান ও টমাস সি শেলিং; আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রেখেছেন জেমস বুকানন ও রোনাল্ড কোস, অর্থনৈতিক সংগঠন নিয়ে কাজ করেছেন অলিভার উইলিয়ামসন, এলিনর অস্ট্রম ও হারবার্ট সাইমন। মনস্তাত্ত্বিক অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন ভারনন এল স্মিথ ও ড্যানিয়েল ক্যায়নেম্যান। এর বাইরে তথ্য অর্থনীতি বিমা, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন আলোকপাত করেছে। এ বিষয়ে আরও পাঁচজন অর্থনীতিবিদকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে (স্টিগলিজ, আকেরলফ, স্পেন্স, ভিকরি ও মিরলেস)। এখনো নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি, এমন অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পদ্ধতি প্রয়োগের কাজ চলছে। ধর্ম থেকে পরিবেশ, কারিগরি পরিবর্তন থেকে নৃতত্ত্ব–সর্বত্র অর্থনীতির বিজয় পতাকা উড়ছে। ব্যয়-উপকার বিশ্লেষণ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির এসব অর্জন বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে এখনো অনেক ক্ষেত্রেই পৌঁছায়নি। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলায় অনেক প্রবাদপ্রতিম অর্থনীতিবিদ জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে এঁরা (সম্ভবত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মোহে) বাংলা ভাষায় লেখার তাগিদ অনুভব করেননি। দ্বিতীয়ত, বাংলা ভাষায় অর্থনৈতিক পরিভাষার দৈন্য রয়েছে। তৃতীয়ত, জন্মগতভাবে বাঙালিরা বামপন্থী। বাংলায় অর্থনীতি নিয়ে যা প্রকাশিত হয়, তার সিংহভাগই হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে ডান-বামের তরজা আর খিস্তি-খেউর। আজ যাকে মূল ধারার অর্থনীতি বলা হয় সে সম্পর্কে বাংলায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা নেহাত অপ্রতুল।


১৯৭৩ সালে কানাডার কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু করি। তখন থেকেই নতুন অর্থনৈতিক তত্ত্বসমূহের বাংলায় উপস্থাপনের তাগিদ অনুভব করছিলাম। তবে সময় করে উঠতে পারিনি। যখন কাজটি হাতে নিলাম, তখন শারীরিক বিভিন্ন অসামর্থ্য দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুসারে অর্থনীতির নতুন তথ্যসমূহ উপস্থাপনের জন্য ২৫ থেকে ৩০টি প্রবন্ধ লিখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কাজ কত দিনে বা আদৌ সম্পূর্ণ করা সম্ভব। হবে কি না জানিনা। আংশিক যতটুকু করতে পেরেছি, তা এ বইয়ে উপস্থাপিত হলো। ভবিষ্যতে সময় ও সুযোগ পেলে এ বিষয়ে আরও লেখার ইচ্ছে রয়েছে।


এ সংকলনে ১০টি প্রবন্ধ রয়েছে। বিষয়বস্তু অনুসারে প্রবন্ধগুলো পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। তিনটি প্রবন্ধের বিষয় হচ্ছে অনভিপ্রেত পরিণামের (unintended consequences) অর্থনীতি। কবিগুরুর ভাষায়, অনভিপ্রেত পরিণামের নির্যাস হচ্ছে, ‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই na।’ এ ঘটনা অর্থনীতিতে হরহামেশাই ঘটছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আনুষ্ঠানিক গবেষণা করেছেন তরুণ মার্কিন অর্থনীতিবিদ স্টিভেন ডি লেভিট। তিনি স্টিফেন জে ডুবনারের সহযোগিতা নিয়ে Freakonomics ও Superfreakonomics নামে দুটি বই লিখেছেন। গ্রন্থ দুটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে অনভিপ্রেত পরিণামের বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ শীর্ষক নিবন্ধে। একই ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ‘মিত্রপক্ষের গুলি’ নিবন্ধে। লেভিট ও ডুবনার অনভিপ্রেত পরিণামের নজির দেখিয়েছেন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মিত্রপক্ষের গুলির পটভূমি আরও বিস্তৃত। এখানে অনভিপ্রেত পরিণামের উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ভারত এবং বাংলাদেশ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ যুক্ত হয়েছে। প্রবন্ধটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। প্রবন্ধটিতে অপচয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণের বাস্তব ও দার্শনিক সমস্যাসমূহ এবং অপচয়রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।


বিশ্বায়ন নিয়ে দুটি প্রবন্ধ রয়েছে এ সংকলনে। একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে বিশ্বায়নের ইতিহাস ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্বায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যা এখনো অসম্পূর্ণ। তাই বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়সমূহও তুলে ধরা হয়েছে। একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধে বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে বিশ্বায়নের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।


শিল্প বিপ্লবের অনেক আগে থেকেই সমাজবিজ্ঞানীরা মানুষের জীবনে সুখের ভূমিকা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। আদি পর্যায়ে অর্থনীতিবিদেরা মানুষের সুখ পরিমাপের চেষ্টা করলেও নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতির আত্মপ্রকাশের পর অর্থনীতিতে সুখ বিষয়টি নির্বাসিত হয়েছে। অতিসম্প্রতি সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে সুখ সম্পর্কে অনেক বিতর্ক চলছে। এই প্রসঙ্গে সুখ ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাসমূহের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়েছে।


গত চার দশকে তথ্য অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘ দিন ধরে লালিত অনেক ধারণাকে নাড়া দিয়েছে। সুকতলার অর্থনীতি ও জুতার রাজনীতি’ শীর্ষক নিবন্ধে তথ্য অর্থনীতির মৌলিক অবদানসমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে।


সমাজবিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত সত্যের সন্ধান করছেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সত্য আর মিথ্যার ফারাক করা অত্যন্ত শক্ত। ‘ভেগোলজি ও অর্থনীতি : না সত্য মিথ্যা’ শীর্ষক নিবন্ধে অর্থনীতির পদ্ধতিগত দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। জন্মদিনের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে এ সংকলনে। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে বিভিন্ন মিথ্যা প্রচারণার ভিত্তিতে বাজার গড়ে ওঠে।



সবশেষে এই বইয়ে বাংলাদেশে সিভিল সমাজ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। এখানে সিভিল সমাজ সম্পর্কে তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বাংলাদেশের সিভিল সমাজের অনন্যতা ও দুর্বলতাসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।


প্রায় দুই বছর ধরে বইটি লেখা হয়েছে। এ সময়ে অনেক শুভানুধ্যায়ী ও আত্মীয়স্বজন আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁদের সবার সাহায্য ছাড়া কাজটি সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। আমার শাশুড়ি জাহানারা রহমান, আমার সহধর্মিণী হামীম খান ও আমার মেয়ে নেহরীন খান বইটি লেখার জন্য আমাকে উৎসাহিত করেছেন ও নানাভাবে সহায়তা করেছেন। আমার ছোট ভাই জি এম জিয়াউদ্দিন খান বইটি লেখার সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে ও বইটির প্রুফ দেখতে সাহায্য করেছে। আরেক ছোট ভাই কবীর উদ্দিন খান অনেক সাংসারিক ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে বইটি লেখার কাজ সহজ করেছেন। সুদূর আমেরিকা থেকে ডক্টর এহসানুর রহমান (ভাইয়া), বীণা আপা ও সেলিম ভাই (জনাব এ কে এন আহমেদ) নানাভাবে সহায়তা করেছেন ও উৎসাহ দিয়েছেন। এদের সবার কাছে আমার ঋণের সীমা নেই।


এই মুহূর্তে বিশেষভাবে স্মরণ করি আমার সদ্য প্রয়াত খালাতো ভাই সাইঁদুর রহমান সাচ্চুকে, যে আমার শারীরিক অসামর্থ্যকে সহনীয় করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছে। সব সময় হাসিমুখে সহায়তা করার জন্য ধন্যবাদ জানাই আতাউল মাসুদ, গোলাম হোসেন, আহমদ আলি, জিয়াউল আনসার ও ফরহাদ উল্লাহ পেরুকে। বইটি লেখার কাজ অনেকাংশে সহজ করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের পরিচালক মামুনুর রশীদকে জানাই বিশেষ কৃতজ্ঞতা। আমার শিক্ষকতা-সহায়ক চন্দন রায় কম্পিউটারের কাজে নানাভাবে সহায়তা করেছে। তাকে ধন্যবাদ জানাই।



বইটি প্রকাশনার ব্যাপারে প্রথমার পক্ষ থেকে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন মতিউর রহমান ও সাজ্জাদ শরিফ। তাদের ধন্যবাদ জানাই। বইটি প্রকাশনায় বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন জাফর আহমদ রাশেদ ও তার সহকর্মীরা। তাঁদের জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।


আকবর আলি খান

গুলশান, ঢাকা

ডিসেম্বর ২০১২